34 C
Dhaka
Monday, May 23, 2022
spot_img

প্রজাতন্ত্র দিবস নয়, প্রয়োজন প্রজাদের সংগঠন

১৭ই এপ্রিল ১৯৭১ মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে একটি সরকার গঠন করা হল। বাঙালী জাতি হাজার বছরে তার নিজ রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার জানান দিলো গোটা দুনিয়াকে। একদল সশস্ত্র তরুণ জয় বাংলা শ্লোগানে মুখরিত করল বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননকে। স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা, পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী শেখ মুজিব হলেন – সেই সরকারের রাস্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলেন উপ রাস্ট্রপতি, তাজউদ্দিন আহমেদ হলেন প্রধানমন্ত্রী। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান ও খন্দকার মোশতাক আহমদ হলেন মন্ত্রীসভার সদস্য। এরপুর্বে ২৫ মার্চ ১৯৭১ এ, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ঝাপিয়ে পড়েছিলো নিরস্ত্র বাঙালি জনগণের ওপর। ইতিহাসে সেটিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় গণহত্যা। দিন পনের পর ১০ এপ্রিল ১৯৭১, তাজউদ্দিন আহমেদ এক বেতার ভাষণে বললেন স্বাধীনতার কথা, বললেন প্রতিরোধ যুদ্ধের আর মাতৃভূমি স্বাধীন করার লক্ষ্যে অস্ত্র হাতে যুদ্ধের কথা, ডাক দিলেন জনযুদ্ধের। গঠিত হল মুক্তিবাহিনী।শেখ মুজিব ছিলেন স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা। তার নামেই হলো বাঙালীর প্রথম রাজধানী। বৈদ্যনাথতলা সেই থেকে মুজিবনগর। প্রথম সরকারটিও মুজিবনগর সরকার হিসেবে পরিচিত।

এসব ইতিহাস। গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস। রক্তের স্রোতে জয় এসেছে, তারপরে পরাজয়। জয় এসেছে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর। পা হতে নখ পর্যন্ত সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনী রেসকোর্স ময়দানে অস্ত্র সমর্পণ করে বিদায় নিয়েছে। শেখ মুজিব ফিরে এসেছে স্বাধীন বাংলায়, নিয়েছেন রাস্ট্রের দ্বায়িত্ব। কিন্তু যে স্বপ্ন তিনি জাতিকে দেখিয়েছিলেন তা
বাস্তবায়নে তার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বড় অংশ তাকে সহযোগিতার বদলে করেছে অসহযোগিতা। একটি অংশ লুটপাটে মত্ত ছিলো, আরেকটি অংশ সমাজতন্ত্রের নামে শুরু করেছিলো অরাজকতা। ছিলো দেশী বিদেশি ষড়যন্ত্র।মুজিব একদিন লাশ হয়ে পড়ে রয়েছে ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িতে। একা নন সপরিবারে নিহত হয়েছেন তিনি। তারপর বন্দী করা হয়েছে তার চার সহকর্মীকে। বন্দী করেছেন তারই আরেক সহকর্মী খন্দকার মোশতাক আহমদ। মুজিবের চার সহকর্মী, যারা তার অনুপস্হিতিতে বাংলাদেশ প্রতিস্ঠার চুড়ান্ত কাজটি করেছিলেন সেই – তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান তাদেরকেও জেলখানায় বন্দী অবস্থায় মেরে ফেলা হয়েছে। খন্দকার মোশতাক আহমদ, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন না তিনিই ফিরিয়ে এনেছেন পাকিস্তানী ভাবাদর্শ। জয় পরিণত হয়েছে পরাজয়ে। মুজিব ও তার সহযোদ্ধাদের রক্তের ওপর নির্মিত হয়েছে মোশতাকের পাকিস্তানি ধারার বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাস্ট্র, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাস্ট্রদুতের ভাষায় ” মডারেট মুসলিম কান্ট্রি ‘।
বাংলাদেশ প্রতিস্ঠার সময় রাস্ট্রটির একটি লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিলো। সেটি বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে সুনির্দিষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ। ভাষার দ্বারা উন্মেষিত বাঙালী জাতিয়তাবাদের প্রকাশ ‘৫২ তে। এবং তারপর অব্যাহত সংগ্রামের ভেতর দিয়ে জাতীয়তাবাদের সাথে যুক্ত হয়েছে গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরেপেক্ষতা। এটি বাংলাদেশের রাস্ট্র প্রতিষ্ঠায় জণগণের অর্জন, যা পরবর্তীকালে রাস্ট্র হতে বিসর্জন দেয়া হয়েছে। সে কারণেই ঐ সময়ে বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতাকারী রাস্ট্রের রাস্ট্রদুত বাংলাদেশের ভেতর পাকিস্তান খোঁজে।
যে যাই খুঁজক না কেন বিগত পঞ্চাশ বছরে জনগন বাংলাদেশকে অগ্রসর করে নিয়ে গেছে। রাস্ট্রের চরিত্রটি পাল্টে ফেলার পরও নেতৃত্বহীন বাঙালি নিজ উদ্যোগে রাস্ট্রের আয় বাড়িয়েছে কিন্তু বৈষম্য কমেনি। আয় বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বৈষম্য।বৈষম্য বাড়ার মুল কারণ অপশাসন কিংবা সুশাসনের অভাব, সামাজিক অস্হিরতা, ন্যায়বিচারের সংকট। সুশাসনের অভাব, কারণ জণগণের আকাংখা প্রতিফলিত হয়, এমন রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতি। এটা পঞ্চাশ বছর পুর্বেই বোঝা গেছে। শেখ মুজিব ও তার চার সহকর্মীর আকাংখা আর জণগণের আকাংখা এক হলেও মাঝে যে সংগঠনটি, যেটি নিয়ে মুজিব চলেন সেই আওয়ামী লীগোর বিপরীতে চলার জন্যই এমন পরাজয় । আওয়ামী লীগ মুজিবকে প্রশংসায় তুস্ট রেখে জণগণের ওপর নিপীড়কের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলো। রাস্ট্রজনক যখন মৃত তখন আওয়ামী লীগ প্রতিবাদহীন। কারণ সে মুজিবের রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করে না। যুদ্ধপরবর্তী সাড়ে তিনবছরে আওয়ামী লীগ নিজের প্রতিনিধিত্ব করে, সেটা হচ্ছে – ক্ষমতাকে ব্যবহার করে রাস্ট্রের আনুকূল্যে নিয়মনীতির বাইরে গিয়ে নিজের সম্পদ সৃষ্টি করা। সেকারণেই ‘৭১ এর ১০ এপ্রিল যে বক্তৃতা তাজউদ্দিন আহমেদ আকাশবাণী হতে বিশ্ববাসীকে দিয়েছিল- তাতে ঘটনাবলীর পাশাপাশি নুতন রাস্ট্রটির চাওয়া পাওয়ার দিকটিও উঠে এসেছে। সেই চাওয়া পাওয়ার কোন কিছুই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রথম ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিলক্ষিত হয়নি। বরঞ্চ উল্টো পথের যাত্রা শুরু হয়েছে। পথটা এতই এগিয়েছে যে, এখন কপালে টিপ পড়লে নারী নিগৃহীত হন রাস্ট্রের পুলিশ দ্বারা, বিজ্ঞান পড়াতে গিয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষক হেনস্হা হন শিক্ষার্থী দ্বারা।
তাজউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের হয়ে প্রথম যে ভাষণটি দিয়েছিলেন, তাতে পাক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি ক্ষুধার বিরুদ্ধে, বঞ্চনার বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ রাস্ট্রের চরিত্র সম্পর্কে একটা ধারণা ছিলো।

১০ এবং ১৭ এপ্রিল ১৯৭১, দুটো বক্তৃতা দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিস্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, সেটি তার নিজস্ব বক্তব্য না। এটি ‘৫২ তে ভাষা দ্বারা স্ফুরিত জাতীয়তাবাদের চেতনায় সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ রাস্ট্রের চরিত্র সম্পর্কে গণমানুষের আকাঙ্খা। এই আকাঙ্খার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে অনুপস্থিত। তাজউদ্দিন আহমেদ এর পুত্র, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা সোহেল তাজ তার ছোটবোন মেহজাবীন আহমেদ, ১০ এপ্রিলকে প্রজাতন্ত্র দিবস ঘোষণা, জাতীয় চার নেতার প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো, সর্বস্তরের পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সকল অংশে বীরত্বগাঁথা ভুমিকা পালনকারী ব্যক্তিবর্গের জীবনী তুলে ধরার দাবিতে একটি পদযাত্রা করেছেন সংসদ ভবন হতে গণভবন পর্যন্ত। যে দাবিতে সোহেল তাজ করেছে তা নিয়ে ভাববার সময় বহু আগেই এসেছে। আওয়ামী লীগ স্বীকার করুক আর না- ই করুক মুজিব এখনও বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই আওয়ামী লীগের পুঁজি। ‘৫২ হতে ‘৭১ পর্যন্ত ধারাবাহিক সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বাঙালি যে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ গড়ে তুলেছে, যা প্রকাশিত হয়েছে ‘৭২ সালের প্রণীত সংবিধানে অর্থাৎ গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা জাতীয়তাবাদ চর্চা এর আলোকে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিস্ঠা বহু আগেই জরুরী হয়ে আছে, প্রয়োজন সেটির বাস্তবায়ন। রাস্ট্রজনক শেখ মুজিব নিজেই নিজের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে কৃষক শ্রমিকের আওয়ামী লীগ গড়ে তুলেছিলেন এবং সেই দলের নেতা হিসেবেই রাস্ট্রপতি হিসেবে তিনি নিহত হয়েছেন।তার বিপরীতে খন্দকার মোশতাক আহমদ আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। আমরা হয়তো বাকশালী ধারার রাজনৈতিক দল চিন্তা করবো না। শেখ মুজিব একাধিক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে সুইডিশ ধারার গণতন্ত্র ও রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে গেছেন। তাজউদ্দিন আহমেদসহ তার সহকর্মীরা সমাজতন্ত্রের কথা বলে গেছেন- বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিস্ঠার জন্যে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম আজ সময়ের দাবী।

রুস্তম আলী খোকন : কলাম লেখক, সাবেক ছাত্রনেতা।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,044FansLike
3,323FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles