31 C
Dhaka
Wednesday, August 17, 2022
spot_img

আমাদের বাতিঘরঃ কমরেড মনি সিংহ

কলকাতাতেই এক মধ্যবিত্ত সংসারে মণি সিংহের জন্ম। ১৯০১ সালের ২৮ জুলাই। একেবারে বিগত শতাব্দীর শুরুর বছরে।বাবা কালি কুমার সিংহ যখন মারা গেলেন মণি সিংহের বয়স তখন মাত্র আড়াই । মা সরলা দেবী ছিলেন সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ির কণ্যা।
পুত্র মণি সিংহের হাত ধরে বিধবা সরলা দেবী কলকাতার সংসার গুটিয়ে চলে এলেন নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের পিতার বাড়িতে। মাতুলালয়েই বেড়ে ওঠা মণি সিংহের। একসময়ে কেমন করে যেন মণি সিংহ কৈশোরেই জড়িয়ে গেলেন স্বদেশী আন্দোলনে। তারপর সেই পথ হতে খানিকটা সরে এসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হয়ে যাওয়া। ১৯২৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করে কলকাতার শ্রমিক অন্চলেই শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করলেন মণি সিংহ। ১৯৩০ সালের মে মাসের ৯ তারিখে মহান মে দিবসের মিছিল হতে যে আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছিলো কলকাতা শহরে তা সংগঠিত করতে গিয়ে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী মণি সিংহকে জেলে পুড়ে দিলেন। পাঁচ বছর জেলেই কাটলো জীবন। বেরিয়ে এসেও শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুর আড়ালে যেতে পারলেন না।
সুসং দুর্গাপুরে এসে নিজগৃহে নজরবন্দী থাকা অবস্থায় পাটচাষিদের ক্ষোভের কথা জানলেন মণি সিংহ। তাতে জড়ালেন মণি সিংহ। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা খবর পেয়ে মণি সিংহকে জেলের বাইরে রাখা আর সম্ভব হবে না – এমনটাই নিলেন সিদ্ধান্ত। খানিকটা আন্দাজ করে মণি সিংহও ভাবলেন যদি জেলে যেতেই হয়, প্রতিবাদ করে সকলের সামনেই জেলে যাওয়া ভালো। ঘটনা যা ঘটার তাই ঘটলো। এই তরফে জেল খাটলেন আরও দেড় বছর। ১৯৩৭ সালে জেল হতে বেরিয়ে আসবার পর ডাক পড়লো আবার কলকাতায়। ততদিনে সুসং দুর্গাপুরের হিন্দু মুসলমান আদিবাসী হাজং কৃষকরা জমিদারদের অত্যাচার আর শোষণের শৃঙ্খল ভাঙতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নিজেরাই ঠিক করলেন মণি সিংহকে সামনে নিয়েই লড়বেন তারা। ফিরে যাওয়া হলো না কলকাতার মেটিয়াবুরুজের শ্রমিক আন্দোলনে। মাটের টানে শেকড়ের বন্ধনে মণি সিংহ গেঁথে গেলেন বাংলার কৃষককুলের মাঝে।

তারপর একের পর কৃষক আন্দোলন। সাথে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলা। যে আন্দোলন গড়ে তুলতেন সেটি জয়ের লক্ষ্যে। আর স্হায়ীভাবে শোষণ উচ্ছেদের জন্য শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিস্ঠা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলে রাস্ট্র ক্ষমতা দখল করে শোষণের শেকড় উপরে ফেলা।এভাবেই কাজ করেছেন বাংলাদেশের গ্রামান্চলে।
টন্ক আন্দোলন দিয়ে শুরু। সুসং দুর্গাপুরসহ ব্রিটিশ ভারতের কোন কোন জমিদারিতে এমন প্রথা ছিলো।
যার মোদ্দা কথা ছিলো, প্রতি সোয়া একর জমিতে কৃষককে ধান হোক চাই না হোক জমিদারকে ১৬/১৭ মণ ধান দিতে হবে। মৌশুম শেষে বেশির ভাগ ধান জমিদারের গোলায়। হিন্দু মুসলমান কৃষক নির্বিশেষে মণি সিংহকে সামনে নিয়েই ঘটলো বিদ্রোহ। পার্শ্ববর্তী হাজং সম্প্রদায়ও যুক্ত হলো আন্দোলনে। এই আন্দোলন চললো ১৯৪০ পর্যন্ত। টংক প্রথা উচ্ছেদ করা গেলো না বটে, তবে পরিবর্তন আসলো খানিকটা। টংক আন্দোলন আবার ছয় বছর পর একই অন্চলে সংগঠিত করেছিলেন মণি সিংহ।১৯৪৬ সালের এই আন্দোলন শহীদ হয়েছিলেন রাশিমণি নামের এক কৃষানী, সুরেন্দ্র নামের এক কৃষক। কৃষকদের বল্লমের আঘাতে নিহত হন দুই ব্রিটিশ পুলিশ। টংক প্রথার বিলোপ করা সম্ভব না হলেও এবারও অর্জিত হয় কিছু দাবি।

‘৪৬ এর টংক আন্দোলনের পর দেশব্যাপী শুরু হয়
তেভাগা আন্দোলন। এটিও মুলত কৃষক আন্দোলন। তবে তার বিস্তৃত টংক আন্দোলনের চাইতেও বেশি।
তেভাগা আন্দোলনের মুল দাবি উৎপাদিত ফসলের দুইভাগ পাবে ভাগচাষী আর একভাগ পাবে জমির মালিক। এরপুর্বে এটি ছিলো অর্ধেক অর্ধেক। ঔপনিবেশিক আমলের শেষ দিকে এই আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে বাংলায়। উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে এই আন্দোলনের বিস্তৃত ছিলো বেশি।
নির্মমতায় মেতে ওঠে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী। হাজার হাজার কৃষকের সম্মিলিত মিছিলের ওপর চালানো হয় গুলি। এই আন্দোলনে দিনাজপুরে একদিনেই হত্যা করা হয় ২৬ জন কৃষককে। ব্রিটিশের পুলিশ বাহিনীর সাথে জোতদার জমিদারদের গুন্ডা বাহিনীও লেলিয়ে দেয়া হয়। আন্দোলনে যোগ দেয়া নারীদের সম্ভ্রমহানিও ঘটে।নাচোলে ইলা মিত্র এই আন্দোলনের কিংবদন্তি নারী। তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন। আন্দোলনের স্রোতে ভীত হয়ে তার ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন করে ব্রিটিশ সরকার। মণি সিংহ ময়মনসিংহ অন্চলেও এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
তেভাগা আন্দোলনে সারাদেশে জীবন দেন প্রায় পঞ্চাশ জন কৃষক ও কমিউনিস্ট নেতা। গ্রেফতার বরণ করেন প্রায় ৩১১২ জন। আর এসবই উঠে এসেছে মণি সিংহের জীবন নিয়ে লেখা তারই রচিত জীবন সংগ্রাম গ্রন্হে।
কৃষককুলের সাথে জড়িয়ে পড়ার পর ১৯৪৫ সালে ৩,৪ এপ্রিল সর্বভারতীয় কৃষক সভার সম্মেলন হয়েছিলো ময়মনসিংহের নেত্রকোনায়। এটি এই অন্চলের জন্য গৌরবের। কমরেড মুজাফফর আহমেদ যিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন, মণি সিংহের কৃষককুলের সাথে মিশে যাওয়াতেই অতো বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ৫০ হাজার বাঁশ দিয়ে সম্মেলনের আগতদের স্টেজসহ থাকার ব্যবস্হা করেছিলো কৃষকরা। টিউবওয়েল পুঁতেছিলো ২৫ টি। ৫০০ হ্যাজাক লাইটের ব্যবস্হা কৃষকরাই করেছিলো। ঐ সম্মেলনে মণি সিংহ ছিলেন অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি। প্রকাশ্য সমাবেশে একলক্ষ মানুষ সমবেত হয়েছিলো।প্রতিদিন প্রতিবেলা একুশ হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্হা নেত্রকোনার কৃষকরাই করেছিলেন।
মণিসিংহকে কৃষকরা নাম দিয়েছিলেন মণিরাজ বলে। সম্বোধন করতেন সেই উপাধিতেই। এই উপাধি এসেছিলো কিষাণ কিষাণীর অন্তর থেকে।
জণগণের ভেতর নিজেকে প্রবেশ করিয়ে মণিসিংহ হয়েছিলেন মণিরাজ।জীবনের কুড়িটি বছর কখনও জেলে কখনও হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরেছেন মণি সিংহ শ্রেনীহীন সমাজ প্রতিস্ঠার জন্য। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পুর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির মুল নেতা তিনি। তাকে ধরিয়ে দিতে পারলে দশ হাজার টাকা পুরস্কারের ঘোষণাও ছিলো পাকিস্তান সরকারের। সবকিছুই পরাস্ত হয়েছে মণিরাজের আদর্শবাদী জীবন ধারার কাছে।
বাংলাদেশ রাস্ট্রের স্রস্টা শেখ মুজিব ১৯৬১ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সৃষ্টির পরিকল্পনাটি প্রথম প্রকাশ করেছিলেন মণি সিংহের নিকট। সততা, নিস্ঠা,দেশপ্রেমের আঁকড়ে মোড়া মণিরাজ মণি সিংহকেই বেছে নিয়েছিলেন পরিকল্পনাটি প্রকাশের আস্হাশীল মানুষ হিসেবে।
আজকের বাংলাদেশে মণি সিংহের মতন রাজনীতিক প্রবাদ পুরুষ। চলমান বাংলাদেশের রাজনীতি বলছে – এদেশে আর মণি সিংহের মতন নেতার জন্ম অসম্ভব। পাঠ্যপুস্তকে মণি সিংহের সংগ্রামী জীবন যুক্ত করার দাবি বহুদিনের।দাবিটি দাবিই রয়ে গেছে।বৈষম্য, দুর্নীতি, আদর্শহীনতা আর সাম্প্রদায়িক ও ভোগবাদীতার মেঘে ঢাকা বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে মণিরাজের দেখা এখন আর নেই।
কোন একদিন এই মেঘ সত্যি সত্যি কেটে যাবে।
মণি সিংহ কোন এক ভোরে সুর্যের মতন উদিত হবে।
সেদিন শ্রমিক জড়িয়ে ধরবে বুকে কৃষককে আর কৃষক শ্রমিককে।
২৮ জুলাই মণিরাজ মণি সিংহ এর জন্মদিন।
মণিরাজের জন্মতিথিতে সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

রুস্তম আলী খোকন : সাবেক ছাত্রনেতা।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,044FansLike
3,437FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles